গরুর দুধ ৫ টাকা লিটার

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি :
করোনাভাইরাসের সংক্রমন রোধে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি মিল্কভিটা কারখানা ৩দিন ধরে বন্ধ হয়েছে। এ কারণে পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার দেড় লাখ দুগ্ধ উৎপাদনকারী কৃষকের উৎপাদিত গরুর দুধ খুচরা বাজারে ২০ থেকে ২৫ টাকা লিটার দরে বিক্রি হলেও শাহজাদপুর উপজেলার পোতাজিয়া প্রাথমিক দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির ননভ্যাট দুধ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫ টাকা লিটার দরে। অবিশ্বাস্য হলেও ঘঁনাটি সত্য বলে জানিয়েছেন এ সমিতির সভাপতি ওয়াজ আলী। তিনি জানান, বাজারে ক্রেতা নেই।তাই কৃষকের কিছুটা লোকসান ঠেকাতে দুধ থেকে মেশিনের সাহায্যে পুরো ভ্যাট তুলে নেওয়া হচ্ছে। এরপর ননভ্যাট দুধ ৫ টাকা লিটার দরে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে স্বল্প আয়ের মানুষ সহজেই দুধ কিনে খেতে পারছে। তিনি আরো বলেন,ভ্যাট তুলে নিলেও দুধের গুণমান ঠিক থাকে। স্বাদের দিক দিয়ে একটু কম হয়। এ ননভ্যাট দুধ দিয়ে দই,মিষ্টি,পায়েশ,পিঠা সব কিছুই তৈরী করা যায়। স্বাস্থ্যের জন্যও খুব ভাল।
তবে যারা এই ভ্যাট তুলতে পারছেন না তাদের দুধ নিয়ে তারা চরম বিপাকে পড়েছেন। দুধ বিক্রি করতে না পেরে তারা ভ্যানে করে দুধ নিয়ে গ্রামে গ্রামে ফেরি করে ২০ থেকে ২৫ টাকা লিটার দরে দুধ বিক্রি করছে। এতে তাদের গো-খাদ্যের দামই উঠছে না। ফলে দুধের রাজধানী খ্যাত পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলায় কৃষকেরা পানির দরে দুধ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ওপর হঠাৎ করেই গো-খাদ্যের দাম বস্তা প্রতি ২০০ থেকে ৩০০টাকা করে বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষকরা চরম লোকসানে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
তিনি জানান,আশিরদশক থেকে পাবনা জেলার বেড়া, সাঁথিয়া, ফরিদপুর, ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর এবং সিরাজগঞ্জ জেলার শাহাজাদপুর ও উল্লাপাড়া উপজেলা নিয়ে দেশের সর্ববৃহৎ দুগ্ধ অঞ্চল গড়ে উঠেছে। শাহজাদপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী এ এলাকায় প্রায় ২৫ হাজারেরও বেশি গো-খামার রয়েছে। এ ছাড়া এ অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি কৃষক তাদের বাসগৃহে দুগ্ধ উৎপাদনকারী গাভী লালন পালন করে থাকে। ফলে প্রতিদিন এ অঞ্চলে প্রায় ১০ লাখ লিটার গরুর দুধ উৎপাদিন হয়ে থাকে। প্রচুর দুধ উৎপাদিত হওয়ায় এ এলাকা থেকে মিল্ক ভিটা, আড়ং, প্রাণ ডেইরি, ফার্মফ্রেস, অ্যামোমিল্ক, আফতাব, রংপুর ডেইরি,ব্র্যাক সহ প্রায় ২০টি দেশীয় প্রতিষ্ঠান তরল দুধ সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করে সারা দেশে বাজারজাত করে থাকে। এ সব প্রতিষ্ঠানের দুধ সংগ্রহের পরিমাণ প্রতিদিন প্রায় পাঁচ লাখ লিটার। বাকি দুধ স্থানীয় ঘোষ বা দুধ ব্যবসায়ীরা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় দুধ সহ ঘি ও ছানা তৈরী করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠিয়ে থাকে। এ ছাড়া স্থানীয় ভাবেও মিষ্টিজাত কারখানাতে ও চায়ের দোকানে প্রচুর দুধ প্রয়োজন হয়।
খামারিরা জানান, দেশে করোনাভাইরাসের প্রভাবে ঢাকা সহ বড় বড় শহরে দুধের চাহিদা কমে গেছে। লোকজন ঢাকা শহর ছাড়তে থাকায় সেখানে গত দু-তিন দিন ধরে দুধ প্রায় চলছেই না। এছাড়া পাবনা-সিরাজগঞ্জ এলাকাতেও দুধের চাহিদা ব্যাপক কমে গেছে। এ এলাকায় শতাধিক ছানা তৈরির কারখানায় প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০ হাজার লিটার দুধের প্রয়োজন হোত। কিন্তু এখন করোনার প্রভাবে বেশির ভাগ ছানা তৈরির কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়া এ এলাকার চায়ের দোকানগুলি গত দুদিন ধরে বন্ধ। মিষ্টি তৈরির দোকানেও দুধের চাহিদা নেই। ফলে গরুর দুধের চাহিদা নেই বললেই চলে।
খামারিদের অভিযোগ, দুধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোই হল খামারি ও কৃষকদের দুধ বিক্রি করার প্রধান ভরসা। কিন্তু বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান দুধ নেওয়া কমিয়ে দিয়েছে। শুধুমাত্র প্রাণ ডেইরি গুঁড়ো দুধ তৈরির জন্য ১ লাখ লিটার দুধ সংগ্রহ অব্যাহত রাখলেও বাকি ৯ লাখ দুধ নিয়ে কৃষক বিপাকে পড়েছে। কৃষকদের দাবি প্রতি লিটার দুধের উৎপাদন খরচ পড়ে ৪২ টাকা। কিন্তু দুধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি লিটার দুধের দাম দিচ্ছে ৩৬ থেকে ৩৮ টাকা। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকাভ‚ক্ত খামারিদের বাইরের কেউ সেখানে দুধ বিক্রি করতে পারছে না। এ অবস্থায় গত দু‘দিন হল অধিকাংশ কৃষক ও খামারিকে স্থানীয় বাজার গুলোতে ও ভ্যানে করে নিয়ে গ্রামে গ্রামে ফেরি করে ২০ থেকে ২৫টাকা লিটার দরে দুধ বিক্রি করতে দেখা গেছে। এ ছাড়া অনেক খামারি গ্রাহক না পাওয়ায় ১০ থেকে ১৫ টাকা লিটার দরেও দুধ বিক্রি করেছেন কলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে মাদলা নতুনপাড়া খামারী জাহাঙ্গী হোসেন,আলমগীর হোসেন ও তানভীর রহমান হালিম জানান,দুধ বিক্রি করতে না পেরে তাদের খামারের উৎপাদিত দুধ বিভিন্ন আত্তীয়-স্বজনের বাড়িতে পাঠিয়েছেন। যেটুকু বিক্রি করেছেন তা মাত্র ১০ টাকা লিটার দরে বিক্রি করা হয়েছে। তারা আরো জানান,ফেসবুকে প্রচার করেও তারা দুধ বিক্রি করতে না পেরে তারা হতাশ হয়ে পড়েছেন।
এ বিষয়ে বেড়া উপজেলার সানিলা এলাকার খামারি আব্দুস সালাম বলেন,আমার খামারে দৈনিক ১০০ লিটার দুধ উৎপাদন হয়। কয়েকদিন আগেও একটি প্রতিষ্ঠান আমার কাছ থেকে দুধ নিয়ে ঢাকায় পাঠাতো। অথচ গত দুদিন ধরে তারা আর নেয় না। তাই বাধ্য হয়ে বাজারে ২০টাকা লিটার দরে বিক্রি করছি।
সাঁথিয়া উপজেলার আমাইকোলা গ্রামের দুধ সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান সেফ মিল্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ শেখ বলেন,১সপ্তাহ আগেও প্রতিদিন প্রায় আড়াই হাজার লিটার দুধ ঢাকায় পাঠাতাম। অথচ এখন ৫০০ লিটারের বেশি পাঠাতে পারছি না। যে সব খামারিদের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করতাম তাঁরা আমাদের মতো প্রতিষ্ঠানে দুধ দিতে না পেরে খোলা বাজারে পানির দরে দুধ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে।
সাঁথিয়া উপজেলার বোয়ালমারী গ্রামের খামারী বেলায়েত হোসেন জানান,তার এলাকায় দুধ ২০ থেকে ২৫টাকা লিটার দরে বিক্রি হচ্ছে। এর উপর করোনাভাইরাসের প্রভাবে হঠাৎ করেই বাজারে গোখাদ্যের দাম বেড়ে গেছে। চারদিন আগেও ৪৫ কেজি ওজনের এক বস্তা ভুসির দাম ছিল ১ হাজার ২২০ টাকা। এখন তা বেড়েয় বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ টাকা। তিন-চারদিনের ব্যবধানে ৩০০ টাকা মণের খরের দাম বেড়ে হয়েছে ৪৫০ টাকা।
মিল্কভিটার আওতাধীন শাহজাদপুর উপজেলার পোতাজিয়া দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির সভাপতি ওয়াজ আলী জানান,মিল্কভিটা বন্ধ থাকায় তাদের সমিতিভুক্ত কৃষকেরা দুধ নিয়ে বিপাকে পড়েছে। তারা পানির দরে ফেরি করে দুধ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। এতে লোকসানের মুখে পড়েছে এ সব কৃষক।
ভাঙ্গুড়াদুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির সভাপতি ফজলুর রহমান জানান পাবনার ভাঙ্গুড়া ও চাটমোহর উপজেলার কৃষকরা ২০ থেকে ২৫ টাকা দরে দুধ বিক্রি করছে। আবার অনেককে স্থান ভেদে ১৫ টাকা দরেও বিক্রি করতে দেখা গেছে। তিনি বলেন দুগ্ধ শিল্প টিকিয়ে রাখতে সরকারকে এ বিষয়ে দ্রæত পদক্ষেপ নিতে হবে।
এ বিষয়ে বাঘাবাড়ি মিল্কভিটা কারখানার ডিজিএম ডা.ইদ্রিস আলী জানান,করোনার প্রভাবে সরকারী নির্দেশে ফ্যাক্টরী বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সরকার আবার নির্দেশ দিলে ফ্যাক্টরী চালু করা হবে। তিনি আরো বলেন করোনার প্রভাবে বাজারে দুধের চাহিদা কমে গেছে। এদিকে ৯০০ মেট্রিকটন উৎপাদিত গুড়ো দুধ অবিক্রিত অবস্থায় গুদামে মজুদ রয়েছে। ফলে নতুন করে গুড়ো দুধ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কারখানা পুরোপুরি বন্ধ করা হয়েছে। এতে কৃষকের সাময়ীক অসুবিধা হলেও আমাদের কিছু করার নাই।

Share via
Copy link